ভারতের 'প্রথম স্বাধীনতা যুদ্ধ' নামে পরিচিত ১৮৫৭ সালের মহাবিদ্রোহ নানান রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, ধর্মীয়, সামাজিক কারণে ঘটেছিল। তোমরা কী জানো, মহাবিদ্রোহের প্রধান কারণগুলো কী কী ছিল? কারাই বা এর নেতৃত্ব দিয়েছিলেন? বিদ্রোহের পরিণতি কী হয়েছিল?
মহাবিদ্রোহের প্রধান কারণগুলো হলো 'লর্ড ডালহৌসী'র স্বত্ত্বলোপনীতি (Doctrine of Lapse), ব্রিটিশ এবং দেশীয় সৈন্যদের মধ্যে ব্যবহারে ভেদাভেদ, খ্রিস্টান ধর্মের বিস্তার এবং সৈন্য বাহিনীর মধ্যে গরু ও শুকরের চর্বি মাখানো বন্দুকের কার্তুজ সরবরাহ।
ডালহৌসী স্বত্ত্ববিলোপ নীতি প্রয়োগ করে ভারতীয় রাজন্যবর্গ ও জমিদার শ্রেণির লোকেদের খেতাব ও বাৎসরিক ভাতা বন্ধ করে দিলে প্রচণ্ড ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। এমনিতেই সাধারণ মানুষের মধ্যে ইংরেজ শাসকদের বিরুদ্ধে একটা অসন্তোষের সৃষ্টি হয়েছিল। অন্যদিকে খ্রিস্টান ধর্মের ব্যাপক প্রচার ও বিস্তারের ফলে এই অসন্তোষ এবং ঘৃণা আরও বৃদ্ধি পেতে থাকে। ১৮৫৬ সালে বিধবা-বিবাহ আইন প্রণয়ন হলে হিন্দুরা একে তাদের সামাজিক ও ধর্মীয় জীবনে বিদেশি শাসকের অনধিকার হস্তক্ষেপ বলে গণ্য করলেন। এদিকে সৈন্যবাহিনীর ইংরেজ অফিসারদের উদ্ধত ব্যবহার ভারতীয় দেশীয় সৈন্যদের উত্তেজিত করে তুলেছিল। যখন নতুন সরবরাহ করা কার্তুজে শুরুর ও গরুর চর্বি মেশানোর গুজব ছড়িয়ে পড়তে লাগল তখন হিন্দু ও মুসলমান উভয় সম্প্রদায়ের সেনানীগণই তাদের ধর্ম বিশ্বাসে আঘাত অনুভব করে ক্ষোভে ফেটে পড়েন।
১৮৫৭ সালের ২৯ মার্চ ব্যারাকপুরে ৩৪তম রেজিমেন্টের সৈন্যদের প্যারেড চলার সময় মঙ্গল পাণ্ডে নামক একজন সৈনিক অকস্মাৎ লাইন ছেড়ে বেরিয়ে এলেন এবং চিৎকার করে অন্যান্য সৈনিকদের ইংরেজ শাসকদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহের আহ্বান জানান। মঙ্গল পাণ্ডে বাধাপ্রাপ্ত হয়ে দুজন ইংরেজ অফিসারকে সেখানেই গুলি করে মেরে ফেলেন। ব্রিটিশ সেনাপতিদের আদেশ সত্ত্বেও কোনও ভারতীয় সৈন্য মঙ্গল পাণ্ডেকে গ্রেপ্তারের জন্য এগিয়ে এলো না। পরে অবশ্য পাণ্ডে গ্রেপ্তার হন এবং তার ফাঁসি হয়ে যায়। এই ঘটনাটি প্রতিটি সৈন্য ছাউনীতে সৈন্যদের ব্রিটিশ শাসকের বিরুদ্ধে উত্তেজিত করে তোলে।
১৮৫৭ সালের মে মাসের ১০ তারিখে মীরাটের ছাউনীতে সৈন্যরা কার্তুজ স্পর্শ করতে অস্বীকার করে। সৈন্যরা এক বিশাল অসামরিক জনতার সঙ্গে মিলিত হয়ে বিদ্রোহ ঘোষণা করে এবং ‘মারো ফিরাঙ্গী কো ধ্বনি দিতে দিতে দাঙ্গা শুরু করে দেয়। তারা জেলখানা ভেঙে বন্দিদের মুক্ত করে দেয়, নারী-পুরুষ নির্বিশেষে ইউরোপীয়দের হত্যা করে, তাদের ঘর-বাড়িতে আগুন লাগিয়ে দেয় এবং দিল্লির দিকে এগিয়ে আসে। অল্প সময়ের মধ্যেই বিদ্রোহের আগুন সমগ্র উত্তর ভারতে দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ে।
এই মহাবিদ্রোহে বিশেষভাবে নেতৃত্ব দেন যাঁরা তাঁদের মধ্যে ছিলেন ঝাঁসির মহারাণী লক্ষ্মীবাঈ, নানা সাহেব, তাতিয়া টোপী প্রভৃতি। লক্ষ্মীবাঈ ইংরেজদের সঙ্গে অমিত বীরত্বের সঙ্গে যুদ্ধ করেন কিন্তু পরিশেষে তাঁর পতন ঘটে। এই মহাবিদ্রোহে সাহায্য করার অপরাধে ভারতের শেষ স্বাধীন নবাব মহম্মদ বাহাদুর শাহ্ জাফরকে বন্দি করে রেঙ্গুনের জেলে পাঠানো হয়।
১৮৫৮ সাল নাগাদ ইংরেজ এই মহাবিদ্রোহকে সম্পূর্ণরূপে দমন করে এবং ভারত কার্যত ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের অধীনে এসে যায়।
Leave a Comment