মানবসভ্যতার গোড়াপত্তনের কাল থেকে সোনা হলো বড় মানুষীর প্রতীক। যেখানে মূর্তিপূজা প্রচলিত সেখানে আস্ত মূর্তি বা মূর্তির গয়নাগাটিও সোনা দিয়ে তৈরি করা হয়। সাধারণ মানুষ তো ছাড়ো রাজা-বাদশারাও সোনা বলতে অজ্ঞান। সোনায় আছে টা কী, যার জন্য লোকে এত পাগল? আর এর দাম বাড়ছে তো বাড়ছেই, খালি বেড়েই চলেছে।

কতগুলো কারণের জন্য একটা জিনিসের দাম নির্ধারিত হতে পারে। প্রথম কারণ হলো, তার দুষ্পাপ্রতা। দ্বিতীয় কারণ হলো তার উপযোগিতা। তৃতীয়, তার সৌন্দর্য। চতুর্থ কারণ হলো, প্রাকৃতিক কারণ সত্ত্বেও যা মোটামুটি অবিকৃত থাকতে সক্ষম, স্বভাবতই তার দাম বেশি হবে। সোনায় এর সবকটা গুণই আছে । খুবই দুষ্প্রাপ্র ধাতু, রঙ আর উজ্জ্বলে এর তুলনা হয় না, ঠাণ্ডা-গরম বা পানি-বাতাসে এর কিছুই হয় না। তাহলে সোনা দামি হবে না কেন?


সোনা চকচকে হলুদ রঙের ধাতু। পাওয়া যায় খুব কম। দুভাবে পাওয়া যেতে পারে শুদ্ধ সোনা হিসেবে বা অন্য কিছুর সঙ্গে মিশ্রিত অবস্থায়। খনি থেকে সোনা তুলে আনা এক বিরাট খরচের ব্যাপার। অস্ট্রেলিয়ার দক্ষিণ- পূর্ব অঞ্চলের ভিক্টোরিয়া প্রদেশে একবার সাড়ে সত্তর কিলোগ্রামের এক চাঙড় পাওয়া যায়। যা থেকে খাঁটি সোনা পাওয়া গিয়েছিল সত্তর কিলোগ্রাম। তবে এরকম কাও কালেভদ্রে ঘটে। খুব অল্প অল্প পরিমাণে খনি থেকে খুঁড়ে ওঠানো হয়। সমুদ্রের পানিতে সোনার সন্ধান পাওয়া যায়, তবে ওঠানোর খরচ পোষায় না ।


পৃথিবীতে সোনার যা উৎপাদন তার শতকরা দশভাগ মাত্র গয়না-গাটি তৈরিতে যায়। কিছু পরিমাণ সোনা কয়েকটা ওষুধ তৈরির কাজেও লাগে। বাদবাকি অংশ, হয় বিভিন্নভাবে জমান হয়, আর নইলে আন্তর্জাতিক ব্যবসা বাণিজ্যের ক্ষেত্রে লেনদেনের কাজে লাগে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় পর্যন্ত (১৯১৪-১৯১৮) সোনা দিয়ে বিভিন্ন দেশের মুদ্রার বিনিময় চলত।


সোনা নরম ধাতু হওয়ার ফলে একে নিয়ে গড়ে-পিটে কাজ করা যায়। পিটিয়ে কাগজের চাইতেও পাতলা করা যায়। অন্য ধাতুর ওপর আস্তরণ দেওয়া যায় ।


খাঁটি সোনাকে ব্যবহারযোগ্য কঠিন করতে হলে একটু তামা আর অন্য ধাতু মেশাতে হয়। সাধারণ এ্যাসিডে এর কোনো বিকার ঘটে না। একমাত্র এ্যাকোয়া রেজিয়া (aqua regia) পারে একে গলাতে। এ্যাকোয়া রেজিয়ার বাংলা নাম হলো অম্লরাজ। এটা তৈরি করা হয় একভাগ নাইট্রিক এ্যাসিড আর তিনভাগ হাইড্রোক্লোরিক এ্যাসিড মিশিয়ে।


তবে সোনার আসল কাজ হলো, ভাঁড়ারের অন্ধকারে আত্মগোপন করা। তাই ধনদৌলত জমা করবার সময় দরকার হয় সোনার, কারণ কাগজের টাকা বিভিন্নভাবে নষ্ট হতে পারে, কিন্তু সোনা চিরকাল টিকে থাকবে।

বর্তমান বিশ্বে আফ্রিকা, সোভিয়েত রাশিয়া আর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সবচেয়ে বেশি সোনা উৎপাদন করে। ভারতবর্ষের কর্ণাটক রাজ্যে কিছু সোনা পাওয়া যায়।

Leave a Comment