প্রতি বছর এমন এক পুরস্কার দেওয়া হয় এবং পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে পুরস্কার বিজেতা হয়ে ওঠেন আলোচনার বিষয়বস্তু। খবরের কাগজ, রেডিও, টেলিভিশন সর্বত্রই এদের নাম, এদের কথা মুখে মুখে ফিরতে থাকে। কিন্তু নোবেল প্রাইজ এমন কী ব্যাপার, যার জন্য একে এত অপরিসীম গুরুত্ব দেওয়া হয়?
নোবেল প্রাইজ হিসেবে দেওয়া হয় একটা সোনার মেডেল, একটা সার্টিফিকেট, আর কিছু টাকা। টাকার অংক তেমন বড় নয়, কিন্তু নোবেল প্রাইজ দেয় অভূতপূর্ব সম্মান, স্বীকৃতি আসে পৃথিবীর সব জায়গা থেকে।
ছয়টি বিভিন্ন বিষয়ে নিজের ক্ষেত্রে বিশিষ্ট অবদান থাকলে তবেই আসে এই পুরষ্কার। বিষয়গুলো হলো: পদার্থবিদ্যা, রসায়নশাস্ত্র, সাহিত্য, শারীরবিদ্যা বা চিকিৎসাশাস্ত্র, শান্তি এবং অর্থনীতি। উনিশশো উনসত্তরে নোবেল প্রাইজের সূচিতে অর্থনীতি একটি বিষয় হিসেবে অন্তর্ভুক্ত হয়। প্রতি ক্ষেত্রে একটি করে পুরস্কার হলেও যদি সেই বিষয়টির ওপর
একাধিক বিশিষ্ট অবদান থাকে, তাহলে পুরস্কারলব্ধ অর্থ সমান ভাগে ভাগ করে দেওয়া হয়।
নোবেল প্রাইজ কী করে আরম্ভ হলো জানো?
আশ্চর্য হলেও সত্যি যে, যিনি তার সারা জীবনের উপার্জন থেকে এমন সব পুরস্কার দেবার কথা চিন্তা করেছিলেন, ব্যবহারিক জীবনে তিনি ছিলেন একটা বিরাট ধ্বংসাত্মক মারণাস্ত্রের আবিষ্কারক। যে বিজ্ঞানী এর আবিষ্কার করেন তার নাম হলো আলফ্রেড বেনহার্ট নোবেল (Alfred Benhard Noble)। এরই নামে পুরস্কারের নাম। জন্ম : একুশ অক্টোবর আঠারশ তেত্রিশ, মৃত্যু : দশ ডিসেম্বর আঠারশ ছিয়ানব্বই সুইডেনে, শিক্ষা রাশিয়াতে। নোবেল যে ভয়ংকর বিস্ফোরক পদার্থ আবিষ্কার করেছিলেন, তার নাম হলো ডিনামাইট (dynamite)। পাহাড় বা অন্য বিরাট কঠিন জিনিস ভাঙার কাজেই যে ডিনামাইট ব্যবহার হয় তাই নয়, যুদ্ধক্ষেত্রে এর প্রয়োজন আরও বেশি।
ডিনামাইটের জন্য নোবেল পেলেন প্রসিন্ধি, এলো অনেক টাকা। মৃত্যুকালে তার সঞ্চয় ছিল নয় লক্ষ বিশ হাজার ডলার। এই সঞ্চিত টাকা থেকেই ঘোষিত হলো ছয়টি বিষয়ে নোবেল পুরস্কার: পদার্থবিদ্যা, রসায়নশাস্ত্র, শারীরবিদ্যা বা চিকিৎসাশাস্ত্র, সাহিত্য ও শান্তি। এই হলো নোবেল প্রাইজ। দেওয়া আরম্ভ হলো উনিশশ এক সাল থেকে ।
পদার্থবিদ্যায় প্রথম নোবেল প্রাইজ পেলেন উইলিয়াম কনরাট রান্টগেন বা রয়েন্ডেন (William Konard Roentgen, 1845-1923)। তিনি আঠারশ পঁচানব্বইয়ে এক্স-রে আবিষ্কার করেন। তাকে দেওয়া হয়েছিল চল্লিশ হাজার ডলার। টাকাটা বড় কথা নয়, তার অবদানকে স্বীকৃতি জানানই হলো আসল কথা ।
সুইডেনের নোবেল ফাউন্ডেশন পুরস্কার দিয়ে থাকেন। সংস্থাগুলোর নাম ও পুরস্কারের বিষয় হলো রয়াল সুইডিশ একাডেমি অফ সায়েন্সেজ (পদার্থবিদ্যা ও রসায়নশাস্ত্র), রয়াল ক্যারোলীন ইন্সটিটিউট (শারীরবিদ্যা বা চিকিৎসাশাস্ত্র) এবং সুইডিশ সাহিত্য-একাডেমি (সাহিত্য)। নরওয়ের পার্লামেন্ট (sterthing-স্টরটিং) পঁচজন সদস্যের একটি কমিটি গঠন করেন যার কাজ হলো, শান্তি-পুরস্কার বিজেতা মনোনয়ন করা।
শ্রেষ্ঠ অবদানের জন্য সারা বিশ্বের বহু মনীষী এই নোবেল প্রাইজ পেয়েছেন। ভারতীয়দের মধ্যে পেয়েছেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (সাহিত্য), চন্দ্রশেখর ভেংকটরামন (পদার্থবিদ্যা) ও মাদার তেরেসা (শান্তি)। আমাদের দেশে পেয়েছেন মুহাম্মদ ইউনূস, তার বিষয় ছিল অর্থনীতি। উনিশ পনের সালে ইংল্যান্ডের সার উইলিয়াম লরেন্স ব্র্যাগ (Sir William Lawrence Bragg) পদার্থবিদ্যার জন্য যখন পুরস্কার পান তখন তার বয়স মাত্র পঁচিশ বছর। তিনিই আজ পর্যন্ত সর্ববয়োকনিষ্ঠ নোবেল পুরস্কার বিজেতা ।
নোবেলের সম্মানার্থে একটি মৌলিক পদার্থের নাম দেওয়া হয়। নোবেলিয়ম (Nobelium element No. 102)
Leave a Comment