আমরা দেখেছি, কিছু কিছু মানুষ কথা বলার সময় তোতলান। এই তুতলিয়ে কথা বলার কারণটি নিয়ে আলোচনা করা যাক। কথা বলা বা স্বর উচ্চারণ একটি অতি জটিল প্রক্রিয়া। শারীরিক ক্রিয়া বিশ্লেষণের পরিপ্রেক্ষিতে আমরা দেখতে পাই, স্বরযন্ত্র (Larynx), চিবুক (Cheeks), জিভ (Tongue) এবং ওষ্ঠের (Lips) মধ্যে একটা সামগ্রিক সমন্বয়ের ফলেই আমাদের গলা থেকে আওয়াজ বেরিয়ে আসে।


আমাদের গলার মধ্যে একটি স্বর-পেটীকা (Voice Box) থাকে। এটির দুদিকে দুটি স্বরতন্ত্রী (Vocal chords) আছে। এই স্বরতন্ত্রীতে কম্পনের ফলেই স্বর সৃষ্টি হয়। এই বাকক্রিয়ার সঙ্গে কয়েকশত মাংসপেশী যুক্ত থাকে ।


সাধারণত আমরা এই জটিল সমন্বয় ব্যবস্থা সম্পর্কে খুব বেশি অবগত নই। কিন্তু, যখন কোনো মানুষকে কথা বলার সময় তোতলাতে দেখি তখন বুঝতে পারি, এই সমন্বয় ব্যবস্থায় কোনো ব্যাঘাত ঘটেছে।


জীব-বিজ্ঞানের পরিভাষায় মানুষের এই তোতলান স্বভাবকে বলা হয় ডিসফেমিয়া (Dysphemia)। ডিসফেমিয়া নানা ধরনের হয়। এক ধরনের ডিসফেমিয়া আছে, যাতে কথা বলার শুরুতেই ব্যক্তিটি তোতলাতে থাকেন এবং পরিষ্কার করে শব্দটি উচ্চারণ করতে পারেন না। বাকপেশীগুলোতে আক্ষেপ (Spasms) শুরু হয়ে যায় এবং প্রথম অক্ষরটি উচ্চারণে বাধা সৃষ্টি হয়। যেমন, 'মন্ত্রী' শব্দটি উচ্চারণের সময় 'ম' অক্ষরেই বাধা সৃষ্টি হয়ে সে উচ্চারণ করে মম মন্ত্রী।


আরেক প্রকারের তোতলামিতে জিভ, গলা এবং মুখমণ্ডলের পেশীসমূহে আক্ষেপ শুরু হয় এবং পেশীগুলো শব্দ উচ্চারণের চেষ্টা করা সত্ত্বেও তা উচ্চারিত হয় না বরং তার চেহারায় বিকার সৃষ্টি হয়।


তোতলান স্বভাব চার পাচ বছর বয়স পর্যন্ত বিশেষ লক্ষ্য করা যায় না। মোটামুটি শৈশবের পর থেকেই এটি শুরু হতে দেখা যায়। মহিলাদের থেকে পুরুষরাই অধিক সংখ্যায় এই রোগের শিকার হন। সমীক্ষা করে দেখা গেছে, এই হার আনুপাতিকভাবে ৪:১।


চিকিৎসক এবং গবেষকগণ এখনও পর্যন্ত এই স্বরসংক্রান্ত বিকৃতির নির্দিষ্ট কোনো কারণ খুঁজে পাননি। সাধারণত শারীরিক বিকৃতি এবং মানসিক দুশ্চিন্তা তোতলামির কারণ বলে মনে করা হয়। দুটি ক্ষেত্রেই উচ্চারণ করে বই পড়া এবং কথা বলার বিশেষ প্রশিক্ষণের মাধ্যমে এই বাক-বিকৃতি কিছু পরিমাণে দূর করা সম্ভব। তোতলা রোগাক্রান্তদের ধীরে ধীরে এবং সচেতনভাবে পড়তে বা কথা বলতে শেখান হয়। কথা বলার সময় তাদের শ্বাস-প্রশ্বাস প্রক্রিয়া নিয়মিত থাকা আবশ্যক। সমীক্ষার ফলে দেখা গেছে, অনেক ক্ষেত্রে তোতলান স্বভাবটি বংশানুক্রমিকভাবে আসে। একটি ক্ষেত্রে দেখা গেছে, ৪০ শতাংশ ব্যক্তিই এটি পেয়েছে তাদের মাতাপিতার কাছ থেকে।


এই বাক-বিকৃতির চিকিৎসা অত্যন্ত জটিল এবং শ্রমসাধ্য । চিকিৎসকদের যেমন দক্ষ হতে হয় তেমনি দায়িত্বশীল এবং ধৈর্যশীলও হতে হয়। এ পর্যন্ত তোতলামির কোনো ঔষধ উদ্ভাবন করা সম্ভব হয়নি। অবশ্য, ফিজিওথেরাপী এবং স্পীচ থেরাপী (Speech therapy) এ-ব্যাপারে বিশেষ কার্যকারী বলে প্রমাণিত হয়েছে।


তোতলামি সারানোর ব্যাপারে মা-বাবার একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা আছে। শিশুরা যাতে অক্ষর বা শব্দের পুনরাবৃত্তি না করে এবং কথা বলার সময় অস্বস্তিতে না ভোগে, সেদিকে তাঁদের বিশেষ নজর দেওয়া উচিত। মা-বাবার সচেতন প্রয়াসের ফলে বহু ক্ষেত্রেই সন্তানদের তোতলামি স্বভাব কমে আসতে দেখা গেছে।

Leave a Comment